মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। মুসলমানদের পবিত্র নগরী মক্কায় গত ৭ আগস্ট তিন দেশের নেতাদের অংশগ্রহণে স্বাক্ষরিত কথিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’কে ঘিরে এখন আগ্রহ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশেও। সরকার জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগে যোগদানের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এলে তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে।
তবে প্রশ্ন হলো—এই প্রতিরক্ষা উদ্যোগটি আসলে কী? এতে বাংলাদেশ যুক্ত হলে দেশের কী ধরনের সুবিধা হতে পারে? আবার নতুন কোনো সামরিক বা কৌশলগত সমীকরণে যুক্ত হওয়ার ফলে ঝুঁকিই বা কতটা?
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কী?
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যেই এই চুক্তির কথা বলা হচ্ছে। এর মূল ধারণা হলো, জোটভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় তৈরি করা এবং কোনো সদস্য রাষ্ট্র হুমকির মুখে পড়লে অন্য সদস্যদের সহযোগিতার সুযোগ রাখা।
চুক্তি নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সম্মিলিত নিরাপত্তার ধারণাটি। অর্থাৎ একটি দেশের ওপর হামলা বা গুরুতর নিরাপত্তা হুমকিকে শুধু একটি দেশের সমস্যা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর জোটের নিরাপত্তা সংকট হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হচ্ছে।
তবে এটি ন্যাটোর মতো পুরোপুরি বাধ্যতামূলক সামরিক জোট কি না, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এখনো স্পষ্টতা রয়েছে। কোনো দেশ আক্রান্ত হলে কতসংখ্যক সেনা পাঠানো হবে, কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়া হবে কিংবা অন্য সদস্য রাষ্ট্রের সামরিক প্রতিক্রিয়া বাধ্যতামূলক হবে কি না এসব বিষয়ে বিস্তারিত কাঠামো প্রকাশ্যে পরিষ্কার নয়।
এ কারণেই বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই উদ্যোগের প্রকৃত শক্তি বোঝা যাবে এর বাস্তব প্রয়োগ এবং সদস্য দেশগুলোর ভবিষ্যৎ আচরণের মাধ্যমে।
কেন এক হলো সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান?
তিন দেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও সামরিক সক্ষমতা ভিন্ন হলেও তাদের পারস্পরিক স্বার্থের কিছু জায়গা রয়েছে। সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম অর্থনৈতিক ও জ্বালানি শক্তি। তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী সামরিক শিল্প, আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতি এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে সক্ষমতা। অন্যদিকে পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত এবং দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
এই তিন দেশের সক্ষমতা একত্রিত করার চিন্তা তাই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন অংশীদার খুঁজছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাজা যুদ্ধ, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক অভিযান এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বহিরাগত শক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে।
বাংলাদেশের আগ্রহ কেন?
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়। মক্কা প্রতিরক্ষা উদ্যোগে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের প্রশ্নে তাই প্রথমেই আসছে দেশটি কী লাভ করতে পারে।
প্রথমত, বড় আকারের একটি নিরাপত্তা সহযোগিতা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হলে বাংলাদেশের সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্র আগে থেকেই রয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজারভিত্তিক সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অন্যতম বড় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই সংকটের টেকসই সমাধান চায় ঢাকা। মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে আরও শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্ক বাংলাদেশের অবস্থানকে কিছু ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ যদি কেবল সামরিক নয়, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার বিস্তৃত কাঠামোর অংশ হতে পারে, তাহলে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে ঝুঁকিও রয়েছে
একটি প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়া শুধু সুবিধার বিষয় নয়। এর সঙ্গে বড় ধরনের কূটনৈতিক দায়িত্ব ও ঝুঁকিও জড়িত থাকে। বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ভারত, চীন ও অন্যান্য শক্তির কৌশলগত প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে নতুন কোনো সামরিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যোগদানের সিদ্ধান্ত প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষ করে ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, পানি ও নিরাপত্তাসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে। তাই বাংলাদেশের নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব নিয়ে দিল্লির কৌশলগত মূল্যায়ন কী হবে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সম্পর্ক বজায় রাখে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গেও সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। ফলে কোনো একটি প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের বহুস্তরীয় কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশ্লেষকদের মতে, জোটের উদ্দেশ্য, সদস্যদের পারস্পরিক দায়বদ্ধতা এবং বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য সামরিক প্রতিশ্রুতির বিষয়গুলো স্পষ্ট না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
এই উদ্যোগ আপাতত তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ভবিষ্যতে আরও মুসলিম দেশ এতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তুরস্কের নেতৃত্ব থেকেও বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার আকাঙ্ক্ষার কথা উঠে এসেছে।
যদি এটি বিস্তৃত হয়, তাহলে মুসলিম বিশ্বের একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক আস্থা, সামরিক সমন্বয় এবং বাস্তব সংকটের সময় একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতার ওপর।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে জাতীয় স্বার্থ। কোনো জোটে যুক্ত হওয়ার আগে এর সামরিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রভাব গভীরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
সব মিলিয়ে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা রাজনীতিতে একটি নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ দেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে, তবে একই সঙ্গে কূটনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটের সদস্য নয়। ভবিষ্যতে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এলে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মক্কা প্রতিরক্ষা উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর জোটে পরিণত হয় এবং বাংলাদেশ সেখানে কোনো ভূমিকা নেয় কি না সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

0 Comments